বশির আলম (গাজীপুর - ঢাকা ) এক সময় সমবায় খাতে রোল মডেল হিসেবে পরিচিত ছিল কিংশুক বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড। তবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানি, তহবিল তছরুপ, অবৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা এবং কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে আমানতের টাকা ফেরত না পেয়ে গাজীপুরের টঙ্গীসহ বিভিন্ন এলাকার শত শত গ্রাহক মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ২০০১ সালের পর প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর থেকেই অনিয়ম ও দুর্নীতির সূত্রপাত ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, সমিতি থেকে প্রায় ২৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা লুটপাট এবং ২০৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা অবৈধভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দিলেও কার্যকর কোনো প্রতিকার পাননি গ্রাহকরা।
গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী কলেজ গেট এলাকায় অবস্থিত শাখায় আমানত রেখেছিলেন বহু নিম্ন ও মধ্যবিত্ত গ্রাহক। কিন্তু কয়েক বছর আগে শাখাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমানতকারীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। বর্তমানে ঢাকার মিরপুর ২ নম্বর বাসস্ট্যান্ড এলাকার কিংশুক টাওয়ারে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও সেখানে গিয়েও গ্রাহকরা কোনো নির্দিষ্ট আশ্বাস পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী নাসরিন আক্তার, একজন গার্মেন্টস শ্রমিক, জানান—
“আমি তিন লাখ টাকা আমানত করেছি। মেয়াদ শেষ হয়েছে চার বছর আগে। অফিসে গিয়ে ঘুরছি, কিন্তু কোনো সমাধান পাচ্ছি না। পরিবারের চিকিৎসার জন্য টাকার খুব প্রয়োজন।”
আরেক ভুক্তভোগী হেনা আক্তার বলেন,
“চার লাখ টাকা জমা রেখেছিলাম। তিন বছরের বেশি সময় ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ। অফিসে গেলে আজ-কাল করে ঘুরাচ্ছে।”
সেলিম মিয়া নামের আরেক আমানতকারী অভিযোগ করে বলেন,
“আমি তিন লাখ টাকা জমা করেছি। তারা নির্দিষ্ট করে কিছুই বলছে না—কবে টাকা ফেরত দেবে।”
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর অফিসে ঘুরেও তারা শুধু আশ্বাস পাচ্ছেন, কিন্তু টাকা ফেরতের কোনো বাস্তব অগ্রগতি নেই। এতে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন অনেকে।
এ বিষয়ে টঙ্গী শাখার তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানটি কার্যত দেউলিয়া হয়ে গেছে। তবে সীমিত আকারে কিছু গ্রাহকের বিনিয়োগ ফেরতের কার্যক্রম চলছে বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে বর্তমান পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোখলেসুর রহমান হাবুলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোন সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। অফিসের টেলিফোন নম্বরেও যোগাযোগ করলেও সম্ভব হয়নি।
সমবায় খাত সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল বলছে, সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের আমানত দ্রুত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমবায় অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর নজরদারির অভাবেই এ ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে সমবায় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রমে কঠোর মনিটরিং এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।