
নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর:
গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হলেও, এ প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ওয়ার্ডে টেন্ডারপ্রাপ্ত কাজ প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে হাতবদল হয়েছে এবং অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশ নতুন পরিচয়ে বিভিন্ন ব্যবসা ও প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৫০ নম্বর ওয়ার্ডে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লাইসেন্স প্রদানকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বিএনপির একাংশের অভিযোগ, সাবেক ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত কাজী মামুনকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লাইসেন্স দেওয়ায় ত্যাগী বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এর প্রতিবাদে ওয়ার্ড বিএনপির নেতাকর্মীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ছবি ও ভিডিওতে কাজী মামুনকে অতীতে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়। ভাইরাল হওয়া কিছু ছবিতে তাকে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের কবর জিয়ারত এবং ছাত্রলীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এছাড়া ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই গাজীপুরা মহাসড়কে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায়ও কাজী মামুনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সেদিন তিনি ছাত্রলীগ নেতা কাজী শুভর নেতৃত্বাধীন একটি দলের সঙ্গে রাজপথে অবস্থান করেছিলেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এই প্রতিবেদনের পক্ষ থেকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিএনপির তৃণমূলের একাধিক নেতা-কর্মী অভিযোগ করে বলেন, অতীতে আওয়ামী লীগের পরিচয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি ও নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত কিছু ব্যক্তি এখন বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যবসা ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। এতে দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা ত্যাগী নেতাকর্মীরা মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ওয়ার্ড বিএনপি নেতা বলেন,
“দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন করা নেতাকর্মীরা যদি মূল্যায়ন না পান এবং অতীতের বিতর্কিত ব্যক্তিরা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, তাহলে দলের ভেতরে অসন্তোষ আরও বাড়বে। অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে এখনই কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি।”
তাদের মতে, প্রকৃত বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলনামূলকভাবে কম। বরং দলে অনুপ্রবেশকারী বিতর্কিত ব্যক্তিদের কারণেই বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কাজী মামুনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে সমালোচনার পর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিজেকে বিএনপির একজন কর্মী বলে দাবি করেছেন বলে জানা যায়।
অন্যদিকে, এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষণ
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন দলে অনুপ্রবেশের অভিযোগ নতুন নয়। তবে এ ধরনের অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দলীয় শৃঙ্খলা, জনআস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম—সবকিছুই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
Leave a Reply