
বশিরআলম (গাজীপুর)
সড়কে দাপিয়ে বেড়ানো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা কমছে না। বরং প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন যান। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব অটোরিকশার একটি বড় অংশ কোনো অনুমোদিত অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্টে নয়, বরং গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ছোট-বড় গ্যারেজ ও টিনশেড কারখানায় তৈরি হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর নেই প্রয়োজনীয় শিল্প-কারখানার অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র কিংবা বৈধ ট্রেড লাইসেন্স। কোথাও গ্যারেজের আড়ালে, কোথাও টিনশেড ঘরে, আবার কোথাও আবাসিক এলাকার কাছাকাছি চলছে অটোরিকশা তৈরির কাজ। ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে অনুমোদনহীন যানবাহনের সংখ্যা, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি।
কয়েক ঘণ্টাতেই লোহার কাঠামো থেকে অটোরিকশা
মাঠপর্যায়ে দেখা যায়, একটি অটোরিকশা তৈরির কাজ শুরু হয় সাধারণ লোহার পাইপ ও কাঠামো দিয়ে। শ্রমিকরা পাইপ কেটে মাপ অনুযায়ী জোড়া দেন। এরপর ওয়েল্ডিংয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয় মূল বডি। বডির সঙ্গে যুক্ত করা হয় চাকা, ব্যাটারি, কন্ট্রোলার ও বৈদ্যুতিক সংযোগ।
পরবর্তী ধাপে বসানো হয় সিট, ছাউনি ও বডির অন্যান্য অংশ। সবশেষে রং করার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি লোহার কাঠামো পরিণত হয় চলন্ত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায়।
অর্থাৎ অনুমোদিত ও মাননিয়ন্ত্রিত কোনো উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে স্থানীয় কারিগরি ব্যবস্থায় তৈরি হচ্ছে এসব যান।
টঙ্গীর চেরাগআলী-কাঁঠালদিয়ায় ছড়িয়ে আছে কারখানা
অনুসন্ধানে টঙ্গী পশ্চিম থানা এলাকার চেরাগআলী ও কাঁঠালদিয়া এলাকায় একাধিক অটোরিকশা তৈরির স্থান থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকায় ছোট-বড় বিভিন্ন গ্যারেজে অটোরিকশার বডি তৈরি, ব্যাটারি সংযোজন, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও রং করার কাজ চলে।
কাঁঠালদিয়া এলাকার মদিনা গ্যারেজে কথা হয় কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে। তাদের ভাষ্য, অটোরিকশার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এক জায়গায় এনে অল্প সময়ের মধ্যেই একটি সম্পূর্ণ যান তৈরি করা সম্ভব হয়।
কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি বলেন, “রিকশার দোকান, যেখানে ব্যাটারি তৈরি ও বিক্রি হয়, সেখানেই রিকশাও তৈরি করা হয়।”
তবে এসব বক্তব্য ও প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
ট্রেড লাইসেন্স নিয়েও প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, সিটি করপোরেশন এলাকায় অটোরিকশা তৈরি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসা পরিচালনাকারী কিছু প্রতিষ্ঠানের বৈধ ট্রেড লাইসেন্সও নেই। এমনকি কোনো কোনো কারখানার পরিবেশগত ছাড়পত্র ও শিল্প-কারখানা হিসেবে নিবন্ধনের বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কিছু অসাধু ব্যক্তিকে নিয়মিত অর্থ দিয়ে এসব কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও সরকারি নথির ভিত্তিতে তা যাচাই করা জরুরি।
সড়কে প্রতিদিন মামলা, তবু থামছে না অটোরিকশা
গাজীপুর মহানগরের বিভিন্ন মহাসড়ক ও প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
সাম্প্রতিক এক অভিযানে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মাত্র কয়েক দিনের অভিযানে এক হাজারের বেশি অবৈধ অটোরিকশা জব্দ এবং শত শত মামলা করা হয়েছিল।
অন্যদিকে স্থানীয় সূত্রের দাবি, গাজীপুর মহানগর ট্রাফিক বিভাগে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মামলা হচ্ছে এবং জরিমানাও আদায় করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে দাবি করা প্রতিদিন ২৫০–৩০০ মামলা এবং মাসে কোটি টাকা জরিমানা আদায়ের তথ্য সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সরকারি হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—একটি অটোরিকশা আটক, মামলা ও জরিমানা করার পরও যদি একই ধরনের নতুন যান কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কারখানা থেকে বের হয়ে আসে, তাহলে শুধু সড়কে অভিযান চালিয়ে সমস্যার কতটা সমাধান সম্ভব?
মহাসড়কে চলাচলে আদালতের নিষেধাজ্ঞা
ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অনুরূপ যান মহাসড়কে চলাচলের বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। ২০২২ সালে আপিল বিভাগ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইককে মহাসড়কে চলাচল না করার নির্দেশ দেয়; তবে অন্যান্য সড়কে সরকারের বিধি অনুযায়ী চলাচলের বিষয়টি আলাদা রাখা হয়।
এরপরও মহাসড়কে এসব যান চলাচল বন্ধ করা যায়নি। চলতি বছরের জুনে সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানান, আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা ও অন্যান্য তিন চাকার যান মহাসড়কে চলছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স ও রুট নিয়ন্ত্রণসহ নতুন নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ কতটা?
সরকার এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে এসব যান ব্যবস্থাপনার জন্য সমন্বিত নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স এবং সমন্বিত লাইসেন্সিং ব্যবস্থার বিষয় রয়েছে।
এ ছাড়া সরকার দেশব্যাপী ব্যাটারিচালিত যানবাহন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরির কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু যানবাহনের চালক বা মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সমস্যার মূল উৎস অক্ষত থেকে যায়। কারণ বাজারে নতুন যান সরবরাহ অব্যাহত থাকলে সড়কে অভিযান চালিয়ে পুরোনো যান সরিয়ে দেওয়ার পরও নতুন যান আবার জায়গা করে নেবে।
মান নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
অনুমোদনহীনভাবে স্থানীয়ভাবে তৈরি হওয়া অটোরিকশাগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—সব যান একই ধরনের নকশা, কাঠামো ও নিরাপত্তামান অনুসরণ করে তৈরি হচ্ছে না।
কোনো কোনো যান তুলনামূলক ছোট ও হালকা, আবার কোনোটি বড় আকারের। কোথাও নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ব্যাটারি, কন্ট্রোলার, ব্রেক, বৈদ্যুতিক সংযোগ, চাকা ও বডির ভারসাম্য ঠিক না থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
সরকারি পর্যায়েও এখন মানসম্মত ই-রিকশার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৫ সালে সরকার নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে ই-রিকশা পরিচালনার উদ্যোগ নেয় এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) উদ্ভাবিত প্রোটোটাইপের ভিত্তিতে মানসম্মত যান চালুর বিষয়টি সামনে আসে।
পরিবেশগত অনুমোদনের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা জরুরি
অটোরিকশা তৈরির সময় ওয়েল্ডিং, ধাতু কাটাকাটি, রং করা, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব কার্যক্রম আবাসিক এলাকার কাছে বা অপরিকল্পিত স্থানে পরিচালিত হলে শব্দ, ধোঁয়া, রাসায়নিক বর্জ্য ও অন্যান্য পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন ধরনের অনুমোদনহীন ও পরিবেশদূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালায়। গাজীপুরেও পরিবেশগত আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে।
তাই টঙ্গীসহ গাজীপুরের অটোরিকশা তৈরির কারখানাগুলোর পরিবেশগত ছাড়পত্র, ট্রেড লাইসেন্স, শিল্প-কারখানার অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা এবং বিদ্যুৎ সংযোগের বৈধতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যৌথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
শুধু সড়কে অভিযান নয়, যেতে হবে উৎপাদনের উৎসে
বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট—সড়কে অভিযান চালিয়ে কয়েকশ যান আটক করলেও যদি একই সময়ে শহরের বিভিন্ন গ্যারেজে নতুন নতুন অটোরিকশা তৈরি হতে থাকে, তাহলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন।
তাই অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, শিল্প কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ বিভাগ, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন।
প্রথমে গাজীপুরের চেরাগআলী, কাঁঠালদিয়া, টঙ্গীসহ বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশা তৈরির কারখানার তালিকা করা, এরপর প্রতিটির ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, শিল্প নিবন্ধন ও অন্যান্য অনুমোদন যাচাই করা যেতে পারে। অনুমোদন না থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে উৎপাদিত যানবাহনের মান ও নিরাপত্তা পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
কারণ সড়কে প্রতিদিন শত শত মামলা ও জরিমানা করেও যদি কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন অটোরিকশা উৎপাদন হয়ে রাস্তায় নামে, তাহলে সেটি অনেকটা **“উৎস খোলা রেখে প্রবাহ বন্ধের চেষ্টা”**র মতোই থেকে যাবে।
গাজীপুরের যানজট, দুর্ঘটনা ও সড়ক নিরাপত্তার সংকট মোকাবিলায় তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—শুধু অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান হবে, নাকি অটোরিকশা তৈরির অবৈধ কারখানাগুলোর বিরুদ্ধেও শুরু হবে কার্যকর অভিযান?
Leave a Reply