
নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর:
অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ, খাদ্য সংযোজন দ্রব্য (ফুড অ্যাডিটিভ) যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও লেবেলিং না করা, কারখানার বিভিন্ন স্থানে তেলাপোকা ও মাছির উপস্থিতি এবং খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখাতে না পারার অভিযোগে গাজীপুরের টঙ্গীর হক ফুড ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডকে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), গাজীপুরের সমন্বয়ে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এসব অনিয়ম выявিত হয়। পরে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ৩৩ ও ৩৮ ধারায় প্রতিষ্ঠানটিকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানার অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে আদায় করা হয়েছে।
কারখানার বিভিন্ন স্থানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ
অভিযানকালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কর্মকর্তারা কারখানার অভ্যন্তরে খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণের বিভিন্ন স্থানে অপরিচ্ছন্নতা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখতে পান। খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযানে উঠে আসে।
এ ছাড়া খাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ফুড অ্যাডিটিভ বা খাদ্য সংযোজন দ্রব্য নির্ধারিত নিয়মে সংরক্ষণ করা হয়নি বলে কর্মকর্তারা জানান। এসব উপকরণের লেবেলিংয়েও ত্রুটি পাওয়া যায়।
তেলাপোকা-মাছির উপস্থিতি
অভিযানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে কারখানার বিভিন্ন স্থানে তেলাপোকা ও মাছির উপস্থিতি দেখতে পান ভ্রাম্যমাণ আদালতের কর্মকর্তারা। খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণের স্থানে এ ধরনের পোকামাকড়ের উপস্থিতি খাদ্যের নিরাপত্তা ও মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উৎপাদন ও সংরক্ষণ এলাকায় পোকামাকড়ের উপস্থিতি থাকলে খাদ্যদূষণের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
সেলফ লাইফ ও ল্যাব পরীক্ষার নথি দেখাতে পারেনি
অভিযানের সময় শুধু কারখানার পরিবেশগত অনিয়ম নয়, খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন-সংক্রান্ত নথিপত্রেও ঘাটতি পাওয়া যায়।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের কর্মকর্তাদের কাছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের সেলফ লাইফ স্টাডি এবং প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি পরীক্ষার প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে পারেনি।
এ ছাড়া খাদ্য সংযোজন দ্রব্য নির্ধারিত মাত্রায় ব্যবহার করা হয়েছে—এমন যথাযথ প্রমাণক বা সংশ্লিষ্ট রেকর্ডও দেখাতে ব্যর্থ হয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।
কাঁচামাল ক্রয়ের নথিতেও ঘাটতি
অভিযানে খাদ্যপণ্য ও কাঁচামাল ক্রয়ের চালান, রসিদসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করার বিষয়টিও উঠে আসে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। এসব নথির ঘাটতি থাকলে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অভিযানে যারা উপস্থিত ছিলেন
জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ মাসুদুর রহমান রুবেলের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়।
অভিযানে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, গাজীপুরের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা ফারজানা ইয়াসমিন সোনিয়া, বিএসটিআইয়ের পরিদর্শক আফসানা ইসলাম কেয়াসহ আনসার ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংশোধনের নির্দেশ
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযানে পাওয়া অনিয়মগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধানের পরিপন্থী।
জরিমানার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এসব অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধে কারখানা কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা নয়; ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করাও তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
অভিযান অব্যাহত থাকবে
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে গাজীপুরের বিভিন্ন খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সমন্বিত অভিযান ও তদারকি অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
তাদের মতে, খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি, পরিচ্ছন্নতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণ নিশ্চিত করা না হলে ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি অনিয়ম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Leave a Reply