
টঙ্গী প্রতিনিধি: গাজীপুরের টঙ্গীতে মাদকের ‘হটস্পট’ হিসেবে পরিচিত হাজির মাজার বস্তিতে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে থাকা রাজউকের নিজস্ব জমিতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করে জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে টঙ্গী বাজারের কলকারখানা অধিদপ্তর সংলগ্ন এলাকায় এ অভিযান শুরু হয়। রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে পে-লোডার, এক্সকাভেটরসহ বিভিন্ন ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকও অংশ নেন।
অভিযানকে কেন্দ্র করে ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়। জিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. বেলায়াত হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে রাজউকের উচ্ছেদকারী দলকে সার্বিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতা প্রদান করে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মো. লিটন সরকারের নেতৃত্বে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অভিযান চলাকালে একের পর এক অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। দীর্ঘদিন ধরে দখল করে রাখা জায়গা থেকে বিভিন্ন স্থাপনা সরিয়ে জমি রাজউকের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
দীর্ঘদিনের মাদকের আস্তানা
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টঙ্গীর হাজির মাজার বস্তিটি দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচার অন্যতম প্রধান স্পট হিসেবে পরিচিত ছিল। বস্তির বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্য ও গোপনে মাদক বিক্রির অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে মাদকসেবী ও মাদক কারবারিদের আনাগোনা বেড়ে যেত বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাদকসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বিচ্ছিন্নভাবে অভিযান পরিচালনা করলেও স্থায়ীভাবে মাদক কারবার বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে অবৈধ স্থাপনা ও দখলদারদের কারণে পুরো এলাকাটি মাদক কারবারিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়।
স্থানীয়দের মতে, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে জায়গাটি দখলমুক্ত করার ফলে মাদক কারবারের পরিবেশ অনেকটাই বন্ধ হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে থাকা সরকারি জমিও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
সরকারি জমি উদ্ধারে রাজউকের অভিযান
রাজউকের কর্মকর্তারা জানান, হাজির মাজার বস্তি এলাকার যে জায়গায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে, সেটি রাজউকের নিজস্ব মালিকানাধীন প্লট। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি ওই জমি অবৈধভাবে দখল করে সেখানে বসতি ও নানা ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করে ব্যবহার করে আসছিলেন।
রাজউকের উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মো. লিটন সরকার বলেন, “রাজউকের এই প্লটটি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আজ প্রশাসনের সহায়তায় অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে আমরা আমাদের জমি বুঝে নিয়েছি।”
তিনি বলেন, সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করে কোনো স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। রাজউকের জমি দখলমুক্ত করার ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
নিরাপত্তায় জিএমপি
উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকায় কোনো ধরনের বড় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পুলিশের সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে রাখেন এবং রাজউকের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. বেলায়াত হোসেন বলেন, “মাদকের অভিশাপ থেকে টঙ্গী এলাকাকে মুক্ত করতে এবং সরকারি জমি পুনরুদ্ধারে এ ধরনের অভিযান অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।”
তিনি আরও বলেন, সরকারি জায়গা দখল করে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
পুনরায় দখল ঠেকাতে নজরদারি
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, উচ্ছেদ করা জায়গায় ভবিষ্যতে যেন আবারও অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে নজরদারি রাখা হবে। একই সঙ্গে নতুন করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাতে জায়গাটি দখলের চেষ্টা করতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, হাজির মাজার বস্তিতে উচ্ছেদ অভিযান দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ। তাদের প্রত্যাশা, শুধু উচ্ছেদ করেই কার্যক্রম শেষ না করে জায়গাটিতে নিয়মিত নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হবে। এতে মাদক কারবারি ও অপরাধীদের পুনরায় সেখানে ঘাঁটি গড়ার সুযোগ কমবে।
অভিযানের ফলে একদিকে যেমন রাজউকের মালিকানাধীন জমি দখলমুক্ত হয়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের মাদক স্পট হিসেবে পরিচিত এলাকাটির অবৈধ স্থাপনাগুলোও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, উদ্ধার করা জমি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে সেখানে আর অবৈধ দখল কিংবা মাদকের আস্তানা গড়ে উঠবে না।
Leave a Reply