
বশির আলম (গাজীপুর প্রতিনিধি):দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা গাজীপুরের টঙ্গীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ টেক্সটাইল মিল—নিউ মন্নু ফাইন কটন মিলস লিমিটেড, নিউ অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড ও নিউ মেঘনা টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড—পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মিলগুলো চালু হলে টঙ্গী ও আশপাশের এলাকায় নতুন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ লক্ষ্যে শনিবার দুপুরে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠসংলগ্ন নবী হাউজে তিন মিলের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মিলগুলোর বর্তমান অবস্থা, দীর্ঘদিনের ঋণের বোঝা, পুরোনো ও অচলপ্রায় যন্ত্রপাতি, প্রয়োজনীয় মূলধন, ব্যাংক ঋণ এবং পুনরায় উৎপাদনে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও তিন মিলের প্রধান উপদেষ্টা এম. মঞ্জুরুল করিম রনি।
দীর্ঘদিনের বন্ধের পেছনে ঋণ ও মূলধন সংকট
সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন—বিটিএমসির আওতাধীন এ তিনটি মিল ২০০১ সালে যৌথ উদ্যোগ বা ‘জয়েন্ট ভেঞ্চার’ ব্যবস্থায় শেয়ারহোল্ডারদের কাছে মালিকানা হস্তান্তরের পর থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় মিলগুলোর আর্থিক অবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, মালিকানা হস্তান্তরের সময় ঋণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও বছরের পর বছর ঋণের ওপর সুদ জমতে জমতে বর্তমানে প্রতিটি মিলের ঋণের পরিমাণ ৪৪ কোটি টাকার বেশি হয়েছে।
শুধু ঋণ নয়, দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে মিলগুলোর উৎপাদন যন্ত্রপাতিও পুরোনো হয়ে পড়েছে। ফলে বর্তমান প্রযুক্তি ও বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদনে ফিরতে হলে বড় ধরনের সংস্কার, আধুনিকায়ন এবং নতুন মূলধন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
সুদ মওকুফ হলে চালুর সম্ভাবনা
নিউ অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু হাসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঋণের সুদ বাড়তে থাকায় মিলগুলোর আর্থিক দায় অনেক বেড়ে গেছে। পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে মিল চালু করাও কঠিন।
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো যদি ঋণের সুদ মওকুফ বা পুনর্গঠনের সুযোগ দেয় এবং প্রয়োজনীয় মূলধনের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে মিলগুলো নতুনভাবে চালু করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ বা ঋণ পুনর্গঠন এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে বন্ধ থাকা কারখানাগুলোর উৎপাদন পুনরায় শুরু করার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।
টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনেও বন্ধ মিলগুলোর সমস্যা উঠে এসেছে
সম্প্রতি বেসরকারি খাতে হস্তান্তরিত বন্ধ কলকারখানাগুলোর ওপর করা একটি সরকারি টাস্কফোর্সের জরিপেও নিউ মেঘনা, নিউ অলিম্পিয়া ও নিউ মুন্নু ফাইন কটন মিলের দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে হস্তান্তরিত ৬৭টি বস্ত্র ও পাটকলের মধ্যে ২৪টি এখনো বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি বস্ত্র কারখানা। তালিকায় রয়েছে নিউ মেঘনা টেক্সটাইল মিলস, নিউ অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিলস এবং নিউ মুন্নু ফাইন কটন মিলস।
টাস্কফোর্স বন্ধ মিলগুলোর সমস্যার মধ্যে মূলধন ঘাটতি, ব্যাংক ঋণের সংকট, পুরোনো ঋণ ও সুদের বোঝা, পুরোনো ও ব্যবহার অনুপযোগী যন্ত্রপাতি, কারিগরি ও প্রশাসনিক দক্ষতার ঘাটতি এবং আধুনিকায়নের অভাবকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শ্রমিক-কর্মচারীদের ব্যবস্থাপনায় হস্তান্তর করা কয়েকটি মিল পর্যাপ্ত মূলধন বিনিয়োগের অভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে মালিকানা হস্তান্তরের পরও অনেক কারখানা উৎপাদনে ফিরতে পারেনি।
টঙ্গীর শিল্পাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান
তিনটি মিলই টঙ্গীর মন্নু নগর শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে গড়ে ওঠা পুরোনো শিল্প অবকাঠামোর অংশ। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের বিভিন্ন তালিকাতেও নিউ মেঘনা টেক্সটাইল মিলসের ঠিকানা মন্নু নগর, টঙ্গী শিল্প এলাকায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পূর্ববর্তী শিল্পতথ্যে ওয়োভেন ডাইংয়ের উৎপাদন সক্ষমতার তথ্যও রয়েছে।
এদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ডাটাবেজেও নিউ অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিলসের মন্নু নগর, টঙ্গী ঠিকানা উল্লেখ রয়েছে।
ফলে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় উৎপাদনে ফিরলে শুধু সরাসরি শ্রমিক নিয়োগই নয়, পরিবহন, কাঁচামাল সরবরাহ, শ্রমিকের আবাসন, খাবারের দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্য সহায়ক খাতেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা।
দ্রুত সমস্যা চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ
মতবিনিময় সভায় সংসদ সদস্য ও প্রধান উপদেষ্টা এম. মঞ্জুরুল করিম রনি পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের মিলগুলোর সুনির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুতের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোন মিল চালু করতে কত অর্থ লাগবে, কোন কোন যন্ত্রপাতি সংস্কার বা পরিবর্তন করতে হবে, ব্যাংক ঋণের বর্তমান অবস্থা কী, ঋণ পুনর্গঠন বা সুদ মওকুফের কী সুযোগ রয়েছে এবং কতজন মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে—এসব বিষয় প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তিনি বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
শুধু কারখানা চালু নয়, প্রয়োজন আধুনিকায়ন
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর তিনটি মিল চালু করতে শুধু পুরোনো যন্ত্রপাতি সচল করলেই হবে না। বর্তমান টেক্সটাইল শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক বাজার বিবেচনায় উৎপাদন প্রযুক্তি আধুনিকায়ন, দক্ষ জনবল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং পর্যাপ্ত চলতি মূলধনের ব্যবস্থা করতে হবে।
একই সঙ্গে অতীতের ঋণ কীভাবে নিষ্পত্তি বা পুনর্গঠন করা হবে, নতুন বিনিয়োগের কাঠামো কী হবে এবং ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা
টঙ্গী ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকারখানার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা জড়িত। বন্ধ তিনটি টেক্সটাইল মিল পুনরায় চালু হলে স্থানীয় শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পরোক্ষভাবেও বহু মানুষের আয়ের পথ তৈরি হতে পারে।
শিল্প খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পুরোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একেবারে পরিত্যক্ত না রেখে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা গেলে একদিকে যেমন বিনিয়োগের ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে তেমনি নতুন শিল্প স্থাপনের তুলনায় বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে তুলনামূলক দ্রুত কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব।
সভায় যারা ছিলেন, তিন মিলের আরেক উপদেষ্টা আলহাজ সালাউদ্দিন সরকার, টঙ্গী পূর্ব থানা বিএনপির সভাপতি সরকার জাবেদ আহাম্মেদ সুমন, টঙ্গী পশ্চিম থানা বিএনপির সভাপতি প্রভাষক বসির উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান নুর ভিপি আসাদ, গাজীপুর মহানগর যুবদলের আহবায়ক সাজেদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান রাজু , ছাত্রদলের সভাপতি রোহানুজ্জামান শুক্কুর, সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিরন, টঙ্গী পশ্চিম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আবু বক্কর সহ মিলগুলোর পরিচালনা পরিষদের সদস্য এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের মে মাসে গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম. মঞ্জুরুল করিম রনিকে নিউ মন্নু ফাইন কটন মিলস লিমিটেড, নিউ অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড ও নিউ মেঘনা টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দীর্ঘ প্রায় আড়াই দশক ধরে বন্ধ থাকা তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবার বাস্তবে কতটা দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে পারে, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের আগ্রহের বিষয়। তবে ঋণ পুনর্গঠন, সুদের বোঝা কমানো, আধুনিকায়নের অর্থায়ন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার সমাধান করা গেলে টঙ্গীর পুরোনো এই শিল্পাঞ্চলে আবারও উৎপাদনের চাকা ঘুরতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Leave a Reply