
নিজস্ব প্রতিবেদক: ভুয়া সেনা পরিচয়, সরকারি চাকরিজীবীর পরিচয় এবং একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে মনিরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে পরিচয় পরিবর্তন করে প্রতারণা চালিয়ে আসার অভিযোগে অবশেষে র্যাব-৬-এর হাতে আটক হয়েছেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) খুলনা অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে মনিরুলকে আটক করা হয়। পরে তাকে খুলনা সদর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মনিরুল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে নিজেকে কখনও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, কখনও সরকারি চাকরিজীবী আবার কখনও ভিন্ন পরিচয়ে উপস্থাপন করতেন। এসব পরিচয় ও একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহার করে মানুষের আস্থা অর্জন করতেন তিনি। বিশেষ করে নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে বিয়ের প্রলোভন, চাকরি দেওয়ার আশ্বাস কিংবা ব্যবসায়িক বিনিয়োগের কথা বলে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, টাকা নেওয়ার পর নানা অজুহাতে যোগাযোগ এড়িয়ে যেতেন মনিরুল। একপর্যায়ে মোবাইল ফোন বন্ধ করে কিংবা স্থান পরিবর্তন করে আত্মগোপনে চলে যেতেন। এভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
টঙ্গীতে প্রায় ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় সাত মাস আগে গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী এলাকায় কয়েকজন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে মনিরুল ইসলাম প্রায় ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দেয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, বিভিন্ন কৌশলে তাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পর মনিরুল যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। পরে তার অবস্থান শনাক্ত করতে গিয়ে জানা যায়, তিনি অন্যত্র গিয়ে নতুন পরিচয় ও নতুন নাম ব্যবহার করছেন।
বিয়ের প্রলোভনে খুলনায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
এদিকে সাহারা নামে এক নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে খুলনায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে মনিরুলের বিরুদ্ধে। ওই নারীর অভিযোগ, খুলনায় নেওয়ার পর বিভিন্ন কৌশলে তার কাছ থেকেও টাকা-পয়সা নেওয়া হয়। পরে তাকে খুলনা সদর থানার একটি ভাড়া বাসায় একা রেখে মনিরুল পালিয়ে যান।
পরবর্তীতে ওই নারী খুলনা সদর থানায় ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন বলে জানা গেছে। মামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযুক্ত মনিরুলকে শনাক্ত ও আটক করতে তৎপরতা শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় র্যাব-৬ অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জামিনে বেরিয়ে আবারও প্রতারণায় সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এর আগেও খুলনায় প্রতারণা ও নারীসংক্রান্ত অভিযোগে আইনগত জটিলতায় পড়েছিলেন মনিরুল ইসলাম। কিছুদিন কারাভোগের পর জামিনে বের হয়ে তিনি আবারও বিভিন্ন এলাকায় নতুন কৌশলে প্রতারণায় সক্রিয় হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, জামিনে বের হওয়ার পর নিজের পরিচয় আরও বেশি পরিবর্তন করতে শুরু করেন তিনি। কখনও ভিন্ন নাম, কখনও ভুয়া পদবি আবার কখনও সামরিক বাহিনীর সদস্যের পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করতেন। এরপর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বিয়ে, চাকরি কিংবা ব্যবসায়িক সুযোগ দেওয়ার কথা বলে অর্থ নেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, একই ব্যক্তি হলেও বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হওয়ায় তার কর্মকাণ্ডের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। এক এলাকায় প্রতারণার অভিযোগ ওঠার পর অন্য এলাকায় গিয়ে নতুন পরিচয়ে একই ধরনের কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহারের অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের দাবি, মনিরুলের প্রতারণার অন্যতম কৌশল ছিল পরিচয় গোপন ও পরিবর্তন করা। পোশাক-পরিচ্ছদ, কথাবার্তা এবং নিজের পেশাগত পরিচয় ব্যবহার করে তিনি বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কখনও নিজেকে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, কখনও সরকারি চাকরিজীবী আবার কখনও ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার ব্যবহৃত পরিচয়পত্র, মোবাইল ফোন, আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগের তথ্য এবং বিভিন্ন এলাকায় চলাফেরার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে।
বিভিন্ন থানায় অভিযোগের তথ্য
খুলনা সদর থানা সূত্রে জানা যায়, মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। গাজীপুরের টঙ্গী পশ্চিম থানাসহ বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও নারীসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই আদালতের চূড়ান্ত রায়ে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়। আরও ভুক্তভোগী রয়েছেন কি না, চলছে অনুসন্ধান ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পরিচয় পরিবর্তন, ছদ্মনাম ব্যবহার এবং নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করায় তাকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। একই সঙ্গে তার ব্যবহৃত পরিচয়পত্র, বিভিন্ন ছদ্মনাম, আর্থিক লেনদেন এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় তার গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তদন্তে আরও কোনো ভুক্তভোগী, নতুন ছদ্মনাম কিংবা প্রতারণার তথ্য বেরিয়ে আসে কি না—এখন সেটিই দেখার বিষয়। এই ব্যক্তি দ্বারা প্রতারণার শিকার হয়ে থাকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন ।
Leave a Reply