
নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর:
গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন ৫২ নম্বর ওয়ার্ডে গুটিয়া ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্জ্য অপসারণকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সরকারি টেন্ডারের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারকে কাজে বাধা দেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বর্জ্যবাহী গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আনোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তিনি বিএনপির নাম ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগকারীর দাবি।
এ ঘটনায় টঙ্গী পশ্চিম থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার মো. সুজ্জত আলী (৪৫)। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আনোয়ার হোসেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি তদন্ত করা হচ্ছে এবং তদন্তে বেআইনি কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, অতীতে বিভিন্ন ব্যক্তি হাসপাতালের বর্জ্য অপসারণের কাজ করলেও বর্তমানে সরকারি টেন্ডারের মাধ্যমে যিনি বৈধভাবে দায়িত্ব পেয়েছেন, তাঁকেই কাজ করতে দেওয়া উচিত। এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ তৈরি হওয়ায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
টেন্ডারের দায়িত্ব পেয়েও কাজ করতে পারছেন না ঠিকাদার
অভিযোগকারী সুজ্জত আলী টঙ্গীর মুদাফা পূর্বপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৩ জুন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সরকারি টেন্ডারের মাধ্যমে তিনি ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পান। এরপর থেকে ওয়ার্ডের বর্জ্য অপসারণের কাজ পরিচালনা করে আসছিলেন তিনি।
তবে গত ৯ অক্টোবর থেকে গুটিয়া ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্জ্য অপসারণ করতে গেলে আনোয়ার হোসেন ও তাঁর সঙ্গে থাকা অজ্ঞাতপরিচয় ১৫ থেকে ২০ জন ব্যক্তি বাধা দেন বলে অভিযোগ করেন সুজ্জত আলী। এ সময় তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো এবং বর্জ্যবাহী গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুজ্জত আলীর দাবি, বর্জ্যবাহী গাড়ি নিয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করতে গেলে তাঁকে বাধা দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি তিনি টঙ্গী পশ্চিম থানা বিএনপির সভাপতিকে জানান। সেখান থেকে আশ্বাস পাওয়ার পর পুনরায় গাড়ি নিয়ে হাসপাতালে গেলেও বর্জ্য অপসারণ করতে পারেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
থানায় বৈঠকেও মেলেনি সমাধান
ঠিকাদার সুজ্জত আলী জানান, বিষয়টি নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাঁকে ফোন করে থানায় বসার জন্য বলেন। পরে থানায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে আনোয়ার হোসেন, তাঁর লোকজন এবং টঙ্গী পশ্চিম থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।
তবে বৈঠকের পরও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ করেন সুজ্জত আলী। তাঁর ভাষ্য, সরকারি নিয়ম মেনে টেন্ডারের মাধ্যমে দায়িত্ব পাওয়ার পরও যদি তিনি বর্জ্য অপসারণ করতে না পারেন, তাহলে তাঁর ব্যবসায়িক ক্ষতি হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈধভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারকে কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সুজ্জত আলীর আরও অভিযোগ, তাঁকে কাজে বাধা দেওয়ার মধ্যেই হাসপাতালের বর্জ্য অপসারণের কাজ অন্যভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
গুটিয়া ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত এক চিকিৎসক জানান, অতীতে বিভিন্ন ব্যক্তি হাসপাতালটির বর্জ্য অপসারণের কাজ করেছেন। ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ কাজ করতেন বলে হাসপাতালসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। ৫ আগস্টের পর স্থানীয় বিএনপি পরিচয় ব্যবহারকারী জালাল নামে এক ব্যক্তি বর্জ্য অপসারণের কাজের সঙ্গে যুক্ত হন বলে জানান ওই চিকিৎসক।
পরবর্তী সময়ে সরকারি টেন্ডারের মাধ্যমে নতুন ঠিকাদার দায়িত্ব নিয়ে বর্জ্য অপসারণ করতে এলে স্থানীয় বিএনপি নেতা পরিচয় দেওয়া আনোয়ার নামে এক ব্যক্তি গাড়ি আটকে দেন এবং ঠিকাদারকে কাজ করতে দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ হাসপাতালসংশ্লিষ্টদের।
তাঁদের বক্তব্য, হাসপাতালের বর্জ্য অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত বিরোধ বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকা উচিত নয়। সরকারি নিয়মে যিনি বৈধভাবে দায়িত্ব পেয়েছেন, তাঁকে আইনসম্মতভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
আনোয়ারের দাবি, তিনি বর্জ্য অপসারণ করেন না
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়টি শুনেছেন। এ নিয়ে থানায় উভয় পক্ষের বসা হয়েছে এবং বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে।
বর্জ্য অপসারণের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগও অস্বীকার করেন আনোয়ার। তাঁর দাবি, তিনি নিজে বর্জ্য অপসারণ করেন না। তবে ঠিকাদারকে বাধা দেওয়া এবং বর্জ্যবাহী গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও বিভিন্ন অভিযোগ
আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, জমিজমা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানির মতো বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে দাবি করা হচ্ছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আনোয়ারের যোগাযোগ ছিল বলে দাবি করে তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু ছবির প্রসঙ্গ তুলেছেন অভিযোগকারীর পক্ষের লোকজন।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারেন।
আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পুলিশের
এ বিষয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফ হোসেন বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। কেউ বেআইনিভাবে কাউকে বাধাগ্রস্ত করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে কোনো অপরাধ করার সুযোগ দেওয়া হবে না—তিনি যত বড় প্রভাবশালীই হোন না কেন।
ঠিকাদার সুজ্জত আলী অভিযোগটির দ্রুত তদন্ত, সরকারি টেন্ডারের আওতায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ নির্বিঘ্নে পরিচালনার সুযোগ এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
Leave a Reply