
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য ও মামলার নথিপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁওয়ের বাগান ও মরা চেলা এলাকাসহ গিদুর ছালা এলাকায় ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দিন-রাত এসব এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুফি আলম ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে এসব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রায় ১০টি ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, নদীতীর ও আশপাশের বসতবাড়ি হুমকির মুখে পড়েছে।
বিশেষ করে সীমান্তবর্তী সোনারপুর ও পূর্ব সোনারপুর এলাকায় নদীতীর ভাঙন এবং বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে কৃষিজমি, বসতভিটা ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এসব এলাকায় বালু উত্তোলনের অনুমতি, ইজারার শর্ত, উত্তোলনের পরিমাণ এবং পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তফসিলদার রেবুল কুমার দাসের সহযোগিতা ও আগাম সতর্কবার্তার কারণে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা প্রশাসনিক অভিযানের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন। তাঁদের অভিযোগ, অভিযান পরিচালনার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্ক করে দেওয়া হয়। ফলে অভিযান চালিয়েও কার্যকর ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয় সূত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, রেবুল কুমার দাস সাবেক স্থানীয় আওয়ামী লীগদলীয় এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তাই অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় ছাতক থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মামলাটির বাদী তফসিলদার রেবুল কুমার দাস। তবে মামলায় প্রকৃত অপরাধীদের পরিবর্তে নিরপরাধ ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
মামলার ১৫ নম্বর আসামি সিলেট শহরের কাপড় ব্যবসায়ী সুজন মিয়া (৪৬) দাবি করেন, ঘটনার দিন ও সময়ে তিনি সিলেট শহরে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থান করছিলেন। তাঁর ভাষ্য, মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর), অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করলে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
সুজন মিয়ার অভিযোগ, মামলায় আসামি হওয়ার পর তিনি তদন্তকারী কর্মকর্তা ছাতক থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জয়ন্ত চন্দ্র দের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পাশাপাশি তফসিলদার রেবুল কুমার দাসের কাছেও নিজের অবস্থান ও নির্দোষিতার বিষয়টি তুলে ধরেন।
সুজন মিয়ার দাবি, মামলা থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে যোগাযোগ করলে তফসিলদার রেবুল কুমার দাস পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টি সমাধান করে নাম বাদ দেওয়ার জন্য ওই অর্থ প্রয়োজন বলে তাঁকে জানানো হয়।
সুজন মিয়ার ভাষ্য, টাকা দিতে না পারলে মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়া সম্ভব হবে না—এমন বক্তব্যও তাঁকে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে অর্থ দাবির অভিযোগের বিষয়ে কোনো অডিও রেকর্ড, লিখিত যোগাযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য বা অন্য কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্যও জানা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
একই ঘটনায় অবৈধ বালু উত্তোলন এবং মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবির অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। তাঁরা মনে করছেন, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা এবং নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধ করা সম্ভব হবে।
এ ক্ষেত্রে মামলার এজাহার, সাক্ষীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের তথ্য, ড্রেজার পরিচালনার নথি, বালু উত্তোলনের অনুমতিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের মোবাইল ফোনের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে অর্থ দাবির অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সুজন মিয়া ও স্থানীয় অভিযোগকারীরা ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসন এবং বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে—অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ তদন্ত, নদীতীর ও পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, মামলায় আসামি করার ক্ষেত্রে তথ্য-প্রমাণ যাচাই এবং অর্থ দাবির অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধান।
তাঁরা আরও দাবি করেছেন, তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত ব্যক্তিদের যেন হয়রানির শিকার হতে না হয় এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ দাবির অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক লিখিত বক্তব্য বা নির্দিষ্ট তদন্তের সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে তফসিলদার রেবুল কুমার দাস, ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুফি আলম এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জয়ন্ত চন্দ্র দের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
সার্বিকভাবে, ছাতকে অবৈধ বালু উত্তোলন, পরিবেশের ক্ষতি, নিরপরাধ ব্যক্তিদের মামলায় জড়ানো এবং পাঁচ লাখ টাকা দাবির অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুনাম ও আইনগত অধিকার সুরক্ষিত রাখা—উভয়ই নিশ্চিত করা জরুরি।
Leave a Reply