
বশির আলম (নিজস্ব প্রতিবেদক) :
বাংলাদেশ পুলিশে একযোগে ৪ হাজার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদে সরাসরি নিয়োগের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে বাহিনীর ভেতরে তীব্র অসন্তোষ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত বিভাগীয় পদোন্নতি প্রত্যাশীরা অভিযোগ করছেন, প্রচলিত নিয়ম ভেঙে সরাসরি নিয়োগের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে, যার ফলে তারা ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৮৩ বছর পুরোনো পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল (পিআরবি) ১৯৪৩-এর ৭৪১(বি) ধারা সংশোধনের প্রস্তাব ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
গত মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স শাখা থেকে পাঠানো প্রস্তাবে ৪ হাজার এসআই (নিরস্ত্র) পদ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।
বর্তমান বিধি অনুযায়ী—
৫০% এসআই পদ সরাসরি নিয়োগ
৫০% বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ হওয়ার কথা
কিন্তু নতুন প্রস্তাবে এই ভারসাম্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক।
সরকার ও পুলিশের যুক্তি: আধুনিক অপরাধ মোকাবিলায় নতুন জনবল জরুরি
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমান সময়ে অপরাধের ধরন ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষ করে—
সাইবার অপরাধ
আর্থিক জালিয়াতি
অনলাইন গুজব ও রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচার
হ্যাকিং ও তথ্য চুরি
এসব মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনবল অত্যন্ত প্রয়োজন।
২০১৬ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরির ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বলা হয়েছে, সাইবার নিরাপত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এছাড়া থানায় অনলাইন জিডি, মামলা গ্রহণ, তদন্ত ও গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনায় দক্ষ, শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত কর্মকর্তার অভাব রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
৪ হাজার নতুন পদ সৃজন
সূত্র জানায়, নতুন করে ৪ হাজার এসআই পদ সৃজন করা হয়েছে। বর্তমানে সরাসরি নিয়োগযোগ্য এসআই (নিরস্ত্র) পদের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার ৫৭৪টি।
পুলিশ সদর দপ্তরের দাবি—
এই জনবল দিয়ে দেশের বিস্তৃত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
তাই দ্রুত ও কার্যকরভাবে জনবল বাড়ানোর লক্ষ্যে সরাসরি নিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
বিভাগীয় সদস্যদের তীব্র ক্ষোভ
তবে মাঠপর্যায়ে কর্মরত কনস্টেবল, নায়েক ও এএসআই সদস্যদের মধ্যে এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
তাদের অভিযোগ—
১৫-২০ বছর চাকরি করেও পদোন্নতির সুযোগ সীমিত
প্রচলিত ৫০:৫০ নীতি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে
অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করা হচ্ছে না
একাধিক সদস্য বলেন—
“আমরা জীবনের বড় অংশ এই বাহিনীতে দিয়েছি। এখন নিয়ম পরিবর্তন করে আমাদের সুযোগ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।”
তারা এটিকে “বঞ্চনা” ও “অন্যায় সিদ্ধান্ত” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পদোন্নতিতে বৈষম্যের অভিযোগ
পুলিশের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অভিযোগ রয়েছে—
কনস্টেবল থেকে পদোন্নতিপ্রাপ্ত এসআইদের তুলনায় সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বেশি গুরুত্ব পান
আবার এসআই থেকে এএসপি পদে উন্নীতদের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে
এই বাস্তবতায় সরাসরি নিয়োগ বাড়ানো হলে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পূর্বের উদাহরণ: এএসআই পদেও সংশোধন
এর আগে সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) পদে সরাসরি নিয়োগ চালুর জন্যও পিআরবি সংশোধন করা হয়েছিল।
সেখানে—
৫০% সরাসরি নিয়োগ
৫০% পদোন্নতির বিধান রাখা হয়
এছাড়া নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লিখিত, শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক ও আইটি দক্ষতার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়।
বিশ্লেষণ: ভারসাম্যই এখন মূল প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞদের মতে—
আধুনিক পুলিশিংয়ের জন্য দক্ষ ও প্রযুক্তি-জ্ঞানসম্পন্ন নতুন জনবল প্রয়োজন
একইসঙ্গে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ সদস্যদের ন্যায্য পদোন্নতি নিশ্চিত করাও জরুরি
এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা না করা গেলে বাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষ বাড়তে পারে, যা সামগ্রিক কর্মক্ষমতায় প্রভাব ফেলবে।
উপসংহার
৪০০০ এসআই সরাসরি নিয়োগের উদ্যোগ এখন বড় দুই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়েছে—
পিআরবি ৭৪১(বি) ধারা কতটা সংশোধিত হবে
বিভাগীয় পদোন্নতির সুযোগ কতটা বজায় থাকবে
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে। তবে ইতোমধ্যেই বিষয়টি বাংলাদেশ পুলিশের অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
Leave a Reply