
বশির আলম (গাজীপুর প্রতিনিধি) গাজীপুরের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, সাবেক মন্ত্রী ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র অধ্যাপক এম. এ. মান্নানের ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে তার মৃত্যুকে “পরিকল্পিত হত্যা” দাবি করে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল ২০২৬) টঙ্গীতে ৫৩ নং ওয়ার্ড বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আনিসুর রহমান শিপন এবং সঞ্চালনা করেন সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম লিটন।
বিচার দাবিতে জোরালো বক্তব্য
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে টঙ্গী পশ্চিম থানা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন,
অধ্যাপক মান্নান মন্ত্রী ও মেয়র থাকাকালীন গাজীপুরে শিক্ষা, সড়ক, ড্রেনেজ ও অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তাকে একাধিক মামলায় জড়ানো হয় এবং দীর্ঘ ২৮ মাস কারাগারে রাখা হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, পরিকল্পিত নির্যাতন ও ষড়যন্ত্রের ফলেই অধ্যাপক মান্নানের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এর সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”
দোয়া মাহফিল ও গণসমাগম
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক মান্নানের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। এতে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ প্রায় এক হাজার মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পরে উপস্থিতদের মাঝে তবারক বিতরণ করা হয়। সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন, মনির হোসেন, আতাউর রহমান আতিক, শেখ মোহাম্মদ ইব্রাহিম, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আব্দুল হালিম, নাজমুল হাসান নাঈম, কবির হোসেন, যুবদল নেতা পাপন হোসেন, ছাত্রদল নেতা আরেফিন সিদ্দিক বুলবুল, রিফাত সরকারসহ স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
এছাড়া সমাজসেবক আলমাস ভেন্ডার, রাজু মৃধা, আবু তালেব দীপু এবং শ্রমিক নেতা আরিফও বক্তব্য দেন।
অধ্যাপক এম. এ. মান্নান: জীবন ও কর্ম
অধ্যাপক এম. এ. মান্নান ১৯৫০ সালে গাজীপুরের সালনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবনে তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে এসএসসি, আনন্দমোহন কলেজ থেকে এইচএসসি ও ডিগ্রি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত রসায়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনে তিনি টঙ্গী কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে শুরু করেন। পরবর্তীতে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ১৯৭৮ সালে জাগদলে যোগ দেন, যা পরবর্তীতে বিএনপিতে রূপ নেয়।
রাজনৈতিক পথচলা
১৯৮৪: কাউলতিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত
১৯৯১: সংসদ সদস্য নির্বাচিত ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন
পরবর্তীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন
২০১৩: গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত
মেয়র থাকাকালে নানা রাজনৈতিক জটিলতায় তিনি একাধিকবার বরখাস্ত হন। ২০১৫ সালে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকার পর ২০১৭ সালে জামিনে মুক্তি পান।
মৃত্যু
২০২২ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অধ্যাপক মান্নানের মৃত্যু নিয়ে বিএনপি নেতারা এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দাবি করলেও, সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত বা তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ পায়নি।
ফলে চার বছর পেরিয়ে গেলেও তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন ও বিতর্ক এখনো রয়ে গেছে। অধ্যাপক মান্নানের মৃত্যু ঘিরে রহস্য উন্মোচনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিচার প্রক্রিয়া শুরু না হলে এ ইস্যু ভবিষ্যতেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়ে থাকতে পারে।
Leave a Reply